TO-Nar-03-800px
Narrative

সবচেয়ে উপরে বন্ধুত্ব

 
 

আনিমে আমার জীবনকে ঘিরে আছে। হয়তো জীবনের মহান কোন দর্শন আমি কোন আনিমেতে খুঁজে পেয়েছিলাম, আমাকে তা স্পর্শ করেছিল কিংবা আমি হয়তো বেশ গাধামি করেছি যে আনিমেকে খুব গুরুতররূপে (seriously) গ্রহণ করেছি (তার ভালো সম্ভাবনা আছে)। আমি ভাল একজন বন্ধু হতে চেয়েছিলাম এবং আনিমে আমাকে এমন কিছু চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল যার জন্য আনিমেকে বরণ করে নেওয়া বেশ একটা ব্যাপার হয়েছিল।

আমরা যারা আনিমে ভালোবাসি, আমার মনে হয় শৈশব থেকে বড় হতে হতে আমরা জেনে ফেলি এ পৃথিবীতে কিভাবে একটা মজা নিয়ে বেড়ে উঠতে হবে এবং কল্পনা, রূপকথা, স্বপ্ন কিভাবে সকল বাস্তবতার মাঝেও জিইয়ে রাখতে হবে। Peter Pan এর বলা– “second to the right, and straight on till morning” ঠিকানা ধরে একটা Neverland আমাদের মানসপটে আমরা আকিঁ, আমরা বড় হই শরীরে কিন্তু আমাদের মনকে রাখি তরুণ; কারণ দিনশেষে আমরা বাঁধনহারা। সমুদ্রের বুকে Jolly Roger ওড়ানো আকাশ পানে চেয়ে থাকা নির্ভীক জলদস্যুর দল।

অনেক মানুষের ভাবনায় একটা সমষ্টিগত ভান আছে যেখানে তারা তাদেরকে আলাদাভাবে দেখাতে চায়, এই snobbishness এর কারণে বিভিন্ন বিষয়ের গায়ে একটা মূল্য লাগানো হয় যা তাদেরকে সংজ্ঞায়িত করতে তারা কারো সামনে উপস্থাপন করে। সে অর্থে, একজন শিশু বা কিশোরের “আমি আনিমে দেখি” বলাটা আর একজন যুবকের একই কথা বলাতে বিস্তর ফারাক তৈরি হতে পারে, যেহেতু একজন যুবকের সামাজিক উপস্থিতি আরোপিতভাবে আরো ওজনদার। একজন মধ্যবয়স্ক আনিমের প্রতি তার ভালোবাসা হয়তো লুকিয়ে রাখেন, একসময় হৃদয়টাকে বুড়ো বানিয়ে ফেলেন, আনিমেকে তার নিছক বিনোদন বাদে আর কিছুই মনে হয় না। বা হয়তো আনিমে শুধুই বিনোদন, আমরা যারা বয়স বাড়ার পরও তার মধ্যে বেশি বেশি খুঁজে পাই তাদের হয়তো মেহতাব খানম ম্যামের সাথে যোগাযোগ করা দরকার। অথবা, আনিমের আনন্দ খুঁজে পাওয়া হয়তো একটা বিশেষ ক্ষমতা, সবার সে ক্ষমতা নেই।

এক পরিচিতজন আমাকে বলেছিল যে আনিমেকে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলা যায় (তার একটা উদাহরণ সে দিল– Doraemon, আনিমেটা কিভাবে শিশুদের আচরণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনেছে তাও আমাকে জানাল)। আমি খুব মন খারাপ করলাম এবং বিষয়টা নিয়ে অনেক ব্যস্ততার মাঝেও ভাবতে থাকলাম। শুধু ভাষার পরিবর্তন ছাড়া এমন আরো কোন বিষয় আছে কি? শিক্ষায়তনিক সূত্রে শিশুশিক্ষা নিয়ে উচ্চতর শিক্ষায় জড়িত থাকায় একদিন গবেষক Dr. Kyung-Hee Kim সম্বন্ধে জানতে পারি। তার গবেষণা প্রবন্ধ– The Creativity Crisis বলে যে শিশুর বুদ্ধিমত্তা বাড়ছে কিন্তু সৃজনশীলতা কমছে। সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় যা কমছে তা হল এর বিস্তারণ, মানে কোন একটি ধারণাকে বুঝে নিজের মতো করে মজার বা অভিনব উপায়ে বিস্তৃত করা। আরো বলা হয় যে সৃজনশীলতা এমন একটি কিছু যা শিশুকে স্বাধীনতা প্রদান করে জাগাতে হয়, শিশুকে ঝুঁকি গ্রহণ করতে দিতে হয়। আমার মনে হয়, Doraemon, যা একটি kodomomuke (শিশুদের) আনিমে, ভাষান্তরিত করা হলেই একে শিশুদের জন্য ইতিবাচক এবং সৃজনশীলতা-উদ্দীপক হিসেবে গ্রহণ করা যায়; অবশ্য তারপরও একটা বাংলাদেশি শিশুকে Doraemon এর পরিবর্তে বাংলাদেশে তৈরি কোন অ্যানিমেশন দেখানো যেত– সে দেখত বাংলার সবুজ রঙ, কলাপাতায় টলটলে শিশির, মানুষ যারা চিরচেনা, আপন নদী আর প্রজাপতি। মেইযসিটি’র নতুন স্বপ্ন, একদিন এই ভাবনাটা সত্য করার।

আমরা আনিমের মত আমাদের জীবনের গল্পে নায়ক হতে চাই, জয়ী হতে চাই, সিঞ্চিত হতে চাই এমন বন্ধুত্বে যে পিঠে একটা উষ্ণতা, একটা নির্ভরতা লেগে থাকবে রোদের মতন। আমার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য যে আমি এমন বন্ধুত্ব পেয়েছি। বন্ধু নূরকে বলেছিলাম– “যদি অন্ধকার গভীর রাতে ঢাকার ডাকু রাস্তায় কোন দুর্ঘটনায় পড়ি, আমি মন্টিকে ফোন করব;” নূর বেশ কষ্ট পেয়ে বলেছিল, “Listen শুভ্রা (ও আমাকে দুষ্টামি করে শুভ্রা ডাকে!), আমাকেও ফোন কোরো, তুমি জেনো যে আমি তোমার এমন বন্ধু!”– এর চেয়ে বেশি এ পৃথিবীর বুকে একজন কী চাইতে পারে! আমি মন্টি, নূর, আকি, ওয়াসি, তৌফিক ভাই, তাবু, রুবু, রকি, রিদু, মাসুদ নিজাম, তাসিফ, আনু, রি, মুচ্চান, মিচ্চান এবং আনা– এ নির্দিষ্টসংখ্যক বন্ধু পেয়েছি; যারা আমাকে ভালোবেসেছে, আমাকে জানিয়েছে– পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি কী জিনিস।

মেইযসিটি তাই আমার কাছে বন্ধুত্বের এক আবাহনী সুর, এক মহান মূর্ছনা। প্রতিটি শিশুর চোখের কোণে জ্বলতে থাকা ঝিলিকে আছে একটি করে মেইযসিটি।

মাহমুদ শুভ্র
সহ-প্রতিষ্ঠাতা, টিমওটাকু/মেইযসিটি

২০১৪ সালে মেইযকন ৩ প্রকাশনার জন্য লিখিত।